ব্লকচেইন প্রযুক্তি (Blockchain Technology) | Ahsan Tech Tips
ব্লকচেইন প্রযুক্তি (Blockchain Technology)
ব্লকচেইন (Blockchain) একটি ইংরেজি শব্দ, যার বাংলা অর্থ হলো ‘ব্লকের তৈরি শিকল’। এই পদ্ধতি/ প্রযুক্তি মূলত একটি লেনদেনের প্রযুক্তি যেখানে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে অর্থ সরাসরি স্থানান্তর করা যায়। এই ব্লকচেইন প্রযুক্তি সবচাইতে গতিশীল এবং সুরক্ষিত একটি প্রযুক্তি, যেখানে কেউ চাইলে লেনদেনে কোনো গড়মিল তৈরি করতে পারবে না।
ব্লকচেইন = ব্লক + চেইন এই সিস্টেমে প্রতিটি ব্লক এক একটি একাউন্ট যার প্রতিটি লেনদেন ব্যবস্থাপনা চেইন আকারে পরিচালিত হয়। প্রত্যেকটি ব্লক হ্যাশিং (Hashing) এর মাধ্যমে উচ্চ মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যার ফলে কেউই এখানে হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
ব্লকচেইন এর উৎপত্তি
ক্রিপ্টোগ্রাফিক টেকনোলজি ব্যবহার করে ব্লকচেইন নিয়ে সর্বপ্রথম কাজ করা হয় ১৯৯১ সালের দিকে। যদিও তা সফলতার মুখ দেখতে না পাওয়ার ফলে তার ব্যবহার বিস্তার লাভ করতে পারেনি। এর প্রকৃত ব্যবহারকে কাজে লাগান ২০০৮ সালে সাতোশি নাকামোতো নামে এক ব্যক্তি। যিনি ক্রিপ্টোকারেন্সি তথা বিটকয়েনের লেনদেনের জন্য ব্লকচেইন টেকনোলজির ব্যবহার শুরু করেন। বর্তমানে যার ফলে ব্লকচেইন এর ব্যবহার সম্পর্কে আজ বিশ্বব্যাপি সচেতনতা বাড়তেই আছে।
ব্লকচেইন এর প্রকারভেদ
ব্লক চেইন চার ধরনের হয় যথা -
১। পাবলিক: বিটকয়েন লেনদেন।
২। প্রাইভেট: ব্যাংকের আর্থিক লেনদেন।
৩। হাইব্রিড: হাসপাতালের রোগীর তথ্য সংরক্ষণ।
৪। কনসোর্টিয়াম: বিভিন্ন ব্যাংকের লেনদেন যাচাই করা।
ব্লকচেইন ডেভেলপারের কাজ
একজন ব্লকচেইন ডেভেলপারের কাজ গুলি হলো -
১। নতুন ব্লকচেইন তৈরি করা - যেকোনো নতুন ব্লকচেইন সিস্টেম তৈরি বা পুরোনো সিস্টেম উন্নত করা।
২। স্মার্ট কন্ট্র্যাক্ট তৈরি করা - এটি এমন এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় চুক্তি, যা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে নিজে থেকেই কার্যকর হয়।
৩। ডিসেন্ট্রালাইজড অ্যাপ (DApp) তৈরি করা - এমন অ্যাপ বানানো যা কোনো একক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।
৪। ক্রিপ্টোকারেন্সি তৈরি করা - নতুন ডিজিটাল মুদ্রা (যেমন বিটকয়েন বা ইথেরিয়াম) তৈরি করা।
৫। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা - ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে ডাটা সুরক্ষা ও গোপনীয়তা বজায় রাখা।
ব্লকচেইনের বৈশিষ্ট্য
১। অপরিবর্তনীয় (Immutable): একবার কোনো তথ্য ব্লকচেইনে লেখা হলে অর্থাৎ লেন দেনর তথ্য যুক্ত হলে সেটা আর বদলানো বা মোছা যায় না।
২। বিকেন্দ্রীকরণ (Decentralized): এই তথ্য বা ব্লক চেইন এক জায়গায় থাকে না, বরং অনেক কম্পিউটারে ভাগ হয়ে সংরক্ষণ করা হয়। তাই কেউ একা এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
৩। স্বচ্ছতা (Transparency): লেনদেনের সব তথ্য সবাই দেখতে পারে, কিন্তু কে লেনদেন করছে, সেটা গোপন থাকে।
৪। নিরাপত্তা (Secure): ব্লকচেইনে শক্তিশালী গাণিতিক পদ্ধতি (ক্রিপ্টোগ্রাফি) ব্যবহার করা হয়, যা এটিকে হ্যাক করা প্রায় অসম্ভব করে তোলে।
৫। ঐকমত্য (Consensus): কোনো লেনদেন বৈধ কিনা, সেটা ঠিক করতে নেটওয়ার্কের অনেক গুলি কম্পিউটার একসঙ্গে সম্মতি দেয়।
ব্লক চেইন নোড
ব্লকচেইন নোড হল একটি কম্পিউটার বা ডিভাইস যা ব্লকচেইন নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাজ করে। এটি ব্লকচেইনের তথ্য সংরক্ষণ (store), যাচাই (validate) এবং বিতরণ (propagate) করে। সহজভাবে বললে, ব্লকচেইনের প্রতিটি নোড একটি ছোট সার্ভারের মতো কাজ করে যা পুরো নেটওয়ার্ককে নিরাপদ ও স্বচ্ছ রাখে।
ব্লকচেইন নোড এর প্রকারভেদ
চার ধরনের ব্লকচেইন নোড আছে, যথা -
১। ফুল নোড (Full Node)
২। লাইট নোড (Light Node বা SPV Node - Simplified Payment Verification Node)
৩। মাইনিং নোড (Mining Node)
৪। মাস্টার নোড (Masternode)
ব্লকচেইনের সুবিধা
১। নিরাপদ লেনদেন: মধ্যস্থতাকারী যেমন ব্যাংক ছাড়াই সরাসরি লেনদেন করা যায়, তাই সময় ও খরচ কমে।
২। বিশ্বাসযোগ্য: যেহেতু একবার লেখা তথ্য কোনো ভাবেই বদলানো যায় না, তাই সবাই নিশ্চিন্তে এতে বিশ্বাস করতে পারে।
৩। স্বচ্ছতা: লেনদেনের সমস্ত হিসাব সবার কাছে প্রকাশ্য থাকে, যা দুর্নীতি কমাতে সাহায্য করে।
৪। দ্রুত ও কার্যকর: অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা অটোমেটিক ভবে করা যায়, তাই সময় বাঁচে।
৫। নতুন ব্যবসার সুযোগ: ব্লকচেইন ব্যবহার করে নতুন ধরনের অ্যাপ ও সেবা তৈরি করা সম্ভব, যা মানুষের কাজে লাগে।
ব্লকচেইনের অসুবিধা
১। জটিলতা: প্রযুক্তিটি বোঝা সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন, তাই ব্যবহার করা সহজ নয়।
২। ধীর গতি: অনেক লেনদেন একসঙ্গে হলে, ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক ধীর হয়ে যেতে পারে।
৩। বিদ্যুৎ খরচ: ব্লকচেইন চালাতে প্রচুর কম্পিউটিং শক্তি লাগে, যা বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে।
৪। নিয়ন্ত্রণের অভাব: এটা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে না থাকায়, সমস্যা হলে দ্রুত সমাধান করা কঠিন।
৫। আইনগত জটিলতা: অনেক দেশে ব্লকচেইনের জন্য এখনো স্পষ্ট নিয়ম-কানুন তৈরি হয়নি, যা আইনি সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
ব্লক চেইন এর মূল উপাদান
১। ব্লক (Block)
২। চেইন (Chain)
৩। ক্রিপ্টোগ্রাফি (Cryptography)
৪। বিকেন্দ্রীকরণ (Decentralization)
৫। কনসেনসাস মেকানিজম (Consensus Mechanism)
৬। নোড (Node)
ক্রিপটোকারেন্সি ফ্যাক্ট
বিটকয়েন ট্র্যানজেকশনের ক্ষেত্রে সিকিউরিটির চিন্তা করে প্রত্যেকটি নতুন ব্লক প্রতি ১০ মিনিট পরপর তৈরি করা হয়। তাই আপনি একটি ট্র্যানজেকশন রিকুয়েস্ট করলে ওই ট্র্যানজেকশন নিয়ে নতুন একটি ব্লক তৈরি করতে ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়।
ভবিষ্যতে ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার
বর্তমান সময়ে ব্লকচেইন প্রযুক্তি শুধুমাত্র ব্যবহার করা হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে যেমন: বিটকয়েন। কিন্তু, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি নিম্নলিখিত সেক্টর গুলোতে ব্যবহার করা যেতে পারে -
১। ডেটা স্টোরেজ এবং ডেটা ট্রান্সফার।
২। তথ্য প্রযুক্তি এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা।
৩। ব্যাংকিং এবং বীমা সেক্টর।
৪। সরকারী পরিকল্পনা।
৫। সাইবার নিরাপত্তা।
৬। গোয়েন্দা ব্যুরো।
৭। স্বাস্থ্য।
৮। শিক্ষা ইত্যাদি।
ব্লকচেইনের চ্যালেঞ্জ
ব্লকচেইন প্রযুক্তির সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে -
১। শক্তি ব্যবহার: PoW ভিত্তিক ব্লকচেইনগুলি প্রচুর শক্তি খরচ করে।
২। স্কেলেবিলিটি: উচ্চ ট্রাফিকের সময় লেনদেনের গতি কমে যেতে পারে।
৩। আইনি বাধা: বিভিন্ন দেশে ব্লকচেইনের আইনি স্বীকৃতি নিয়ে সমস্যা রয়েছে।
জনপ্রিয়তা
ব্লক+চেইন হ্যাক করা সত্যিই অসম্ভব যা উপরের লেখা থেকে হয়ত স্পষ্ট ধারণা পেয়েছেন। এছাড়া খুব কম সময়ের মধ্যে আপনি আপনার লেনদেন সম্পন্ন করতে পারছেন। এই টেকনোলজির জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ক্রিপ্টো কারেন্সির সফলতা দেখে অনেক ধরনের ব্যাংক এই টেকনোলজির মাধ্যমে লেনদেনের পরিকল্পনা নিয়েছে । কিছু কিছু ব্যাংক পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ, মানুষ যে কর্মই করুক না কেন টাকা পয়সার সিকিউরিটি না থাকলে উপার্জন করে শান্তিতে ঘুমানো কঠিন।
1.png)
কোন মন্তব্য নেই