ইন্টারনেট অফ থিংস (Internet of Things বা IoT) জানা না জানা কথা | Ahsan Tech Tips
ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) - Internet of Things (IoT)
ইন্টারনেট অফ থিংস (Internet of Things বা IoT) হলো একটি নেটওয়ার্ক যেখানে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ডিভাইস এবং বস্তু ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকে এবং তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। এই ডিভাইসগুলি সেন্সর, সফ্টওয়্যার এবং অন্যান্য প্রযুক্তি দ্বারা সজ্জিত, যা তাদেরকে ডেটা সংগ্রহ, শেয়ার এবং বিশ্লেষণ করতে সক্ষম করে।
সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
“Internet of Things” শব্দটি প্রথম আলোর মুখ দেখে পিটার লুইসের হাত ধরে ১৯৮৫ সালে। তবে বিভিন্ন বস্তু বা ডিভাইসের নেটওয়ার্কের ধারণাটি আরো পুরনো। ১৮৪৪ সালে স্যামুয়েল মোর্স যখন টেলিগ্রাফ আবিষ্কার করে প্রথমবারের মত মোর্স কোড পাবলিক টেলিগ্রাফ ওয়াশিংটন ডিসি থেকে বাল্টিমোরে পাঠাতে সক্ষম হন, বিজ্ঞানীরা এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখা শুরু করে যেটা আসলে আধুনিক IOT ধারণাকেই তুলে ধরে।
আইওটি কীভাবে কাজ করে?
১। ডেটা সংগ্রহ: সেন্সরগুলির মাধ্যমে ডিভাইসগুলি ডেটা সংগ্রহ করে।
২। ডেটা প্রেরণ: ডেটা সংযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সার্ভার বা ক্লাউডে প্রেরণ করা হয়।
৩। ডেটা বিশ্লেষণ: সার্ভার বা ক্লাউডে ডেটা বিশ্লেষণ করা হয়।
৪। সিদ্ধান্ত গ্রহণ: বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সিস্টেম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
৫। ক্রিয়া সম্পাদন: অ্যাকচুয়েটর বা ডিভাইসগুলি সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কার্য সম্পাদন করে।
আইওটি সিস্টেমের উপাদানগুলো
১। ডিভাইস বা সেন্সর: ডেটা সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন সেন্সর ব্যবহার করা হয়।
২। কানেক্টিভিটি: ডিভাইসগুলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকে।
৩। ডেটা প্রসেসিং: ডিভাইস থেকে প্রাপ্ত ডেটা বিশ্লেষণ ও প্রক্রিয়াকরণ হয়।
৪। ইউজার ইন্টারফেস: ব্যবহারকারী ডিভাইসগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
৫। অবকাঠামো: অবকাঠামো হলো ইন্টারনেট কানেকশন।
৬। থিংস: থিংস হলো স্মার্ট ইলেকট্রনিক ডিভাইসসমূহ যারা কানেক্টড থাকবে । যেমন: ক্যামেরা, টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি।
আইওটির প্রয়োগক্ষেত্র
১। স্মার্ট হোমঃ আপনার বাড়ির লাইট, ফ্যান, থার্মোস্ট্যাট থেকে শুরু করে সবকিছু স্মার্ট ডিভাইসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
২। স্মার্ট শহরঃ শহরের ট্রাফিক লাইট, সড়ক বাতি ইত্যাদি আইওটি ডিভাইসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে।
৩। শিল্প খাতঃ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম থেকে সরবরাহ চেইন সব কিছুই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হতে পারে।
৪। স্বাস্থ্যসেবাঃ স্বাস্থ্য পর্যালোচনাকারী ডিভাইসগুলো রোগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসককে তথ্য পাঠাতে পারে।
৫। শিক্ষা ক্ষেত্রেঃ মাটির আর্দ্রতা, তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করে ফসল উৎপাদন বাড়ানো।
৬। সিকিউরিটি ব্যবস্থায়ঃ সুবিধাজনক এবং সুরক্ষিত করতে সাহায্য করবে।
৭। কৃষি ক্ষেত্রেঃ মাটির আর্দ্রতা, তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করে ফসল উৎপাদন বাড়ানো।
আইওটির ভবিষ্যত সম্ভাবনা
আইওটির ভবিষ্যত অত্যন্ত উজ্জ্বল। ৫জি নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি আইওটির অগ্রগতিকে আরও গতিশীল করবে। স্মার্ট হোম থেকে শুরু করে স্মার্ট শহর সবকিছুই আইওটির অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছে। অদূর ভবিষ্যতে আমাদের চারপাশের প্রতিটি বস্তু একে অপরের সাথে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকবে এবং আমাদের জীবন আরও সহজ ও আরামদায়ক হবে।
আইওটির চ্যালেঞ্জগুলো
যদিও আইওটি আমাদের অনেক সুবিধা প্রদান করছে, তবুও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
১। নিরাপত্তা: আইওটি ডিভাইসগুলো হ্যাকিং এবং ডেটা চুরির ঝুঁকিতে থাকে।
২। গোপনীয়তা: ব্যক্তিগত ডেটা সংগ্রহ এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
৩। আন্তঃকার্যকারিতা: বিভিন্ন ডিভাইস এবং প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সামঞ্জস্যের অভাব একটি চ্যালেঞ্জ।
৪। জটিলতা: আইওটি সিস্টেম ডিজাইন, স্থাপন এবং পরিচালনা করা জটিল হতে পারে।
৫। ডেটা ব্যবস্থাপনা: বিপুল পরিমাণ ডেটা সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করা কঠিন হতে পারে।
আইওটির মান এবং কাঠামো
ইন্টারনেট অফ থিংস ( IoT) সমর্থন করতে এবং বিভিন্ন ডিভাইস এবং সিস্টেমের মধ্যে আন্তঃকার্যযোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য বেশ কয়েকটি মান এবং কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সবচেয়ে ব্যাপকভাবে গৃহীত মান এবং কাঠামোর মধ্যে রয়েছে:
১। IPv6: এটি ইন্টারনেট প্রোটোকল (IP) এর সর্বশেষ সংস্করণ, যা ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত প্রতিটি ডিভাইসে একটি অনন্য ঠিকানা প্রদান করে। IPv6 IoT এর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি ঠিকানাগুলির একটি বৃহত্তর পুল প্রদান করে, যা অনেকগুলি ডিভাইসের সংযোগের অনুমতি দেয়।
২। MQTT: এটি একটি লাইটওয়েট মেসেজিং প্রোটোকল যা IoT ডিভাইসের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। MQTT সীমিত ব্যান্ডউইথ সহ কম-পাওয়ার ডিভাইস এবং নেটওয়ার্কে ব্যবহার করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, এটি IoT অ্যাপ্লিকেশনের জন্য আদর্শ করে তোলে।
৩। CoAP: Constrained Application Protocol হল ইন্টারনেট অফ থিংসে সীমাবদ্ধ নোড এবং নেটওয়ার্কগুলির সাথে ব্যবহারের জন্য একটি বিশেষ ওয়েব ট্রান্সফার প্রোটোকল। এটি সেই সীমাবদ্ধ ডিভাইসগুলিকে অনুরূপ প্রোটোকল ব্যবহার করে ওয়েবের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম করে।
৪। LwM2M: লাইটওয়েট মেশিন টু মেশিন ডিভাইস পরিচালনার জন্য ডিজাইন করা একটি প্রোটোকল। এটি ডিভাইসগুলিকে একটি সার্ভারের সাথে যোগাযোগ করতে এবং দূরবর্তীভাবে পরিচালিত হতে দেয়৷
৫। Zigbee: এটি একটি বেতার যোগাযোগের মান যা IoT ডিভাইসগুলিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। Zigbee কম-পাওয়ার ডিভাইসের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে এবং ওয়াইফাই এবং ব্লুটুথের জন্য কম খরচে, কম-পাওয়ার ওয়্যারলেস বিকল্প প্রদান করে।
৬। AllJoyn: ডিভাইস-টু-ডিভাইস যোগাযোগের জন্য একটি ওপেন-সোর্স ফ্রেমওয়ার্ক, এটি ব্র্যান্ড, অপারেটিং সিস্টেম বা পরিবহন নির্বিশেষে ডিভাইসগুলিকে একে অপরের সাথে আবিষ্কার এবং যোগাযোগ করতে দেয়।
৭। Thread: একটি ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কিং প্রোটোকল ওপেন স্ট্যান্ডার্ডের উপর নির্মিত। এটি একটি হোম নেটওয়ার্কে ডিভাইসগুলির মধ্যে স্বল্প-শক্তি, নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ সক্ষম করে৷
আইওটির প্রজেক্ট বা উদাহরণ
আইওটির মাধ্যমে করা যায় এমন কয়েকটি শখের বা হবি প্রজেক্ট এর ধারণা নিচে উল্লেখ করা হলো-
১। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা
২। স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়ার প্রতিবেদন তৈরি
৩। স্মার্ট গ্যারেজ
৪। বায়ু দূষণ পর্যবেক্ষণ
৫। গ্যাস লিক পর্যবেক্ষণ
৬। বন্যার অবস্থা পর্যবেক্ষণ
৭। আধুনিক সেচ প্রকল্প
৮। রাস্তার বাতি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ
৯। পানির বিশুদ্ধতা যাচাই ও পর্যবেক্ষণ
১০। ট্রাফিক লাইট এর তথ্য জানা
১১। ট্রাফিক লাইট নিয়ন্ত্রণ
১২। ফেস ডিটেকশন দরজা
১৩। তরলের স্তর পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ
১৪। আধুনিক পারকিং সিস্টেম
১৫। স্মার্ট চাবি বা মানিব্যাগ ট্র্যাকার
১৬। স্মার্ট স্টোর ট্রলি
১৭। মাটির আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণ
১৮। সেলসম্যান ছাড়া বিক্রয় সেবা
আইওটি ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ও টুলস
১। Arduino: হার্ডওয়্যার প্রোটোটাইপিংয়ের জন্য জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম।
২। Raspberry Pi: সম্পূর্ণ কম্পিউটার হিসেবে কাজ করতে সক্ষম এবং IoT প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়।
৩। MQTT, CoAP: IoT ডিভাইসগুলির মধ্যে হালকা ওজনের যোগাযোগ প্রোটোকল।
কোন মন্তব্য নেই